বর্ণই কি মানুষের পরিচয়ই? [ is colour is the identity of man ?]

                    




আমরা দুই ভাই, আমি বড়, ছোট ভাইয়ের প্রতি ভালোবাসা আমার আগে থেকেই। একসঙ্গে খাওয়া,  খেলা করা, এমনকি দুষ্টুমি করার সময় দুই ভাই পরিকল্পনা করেই মা কে জ্বালাতন করতাম। কখনোই ছোটুকে নিজের থেকে আলাদা করতাম না, বড় দাদা নয় বন্ধু হয়ে তার সঙ্গে মিশেছিলাম। এই ভাবেই হাসতে খেলতে দিনগুলো কাটছিল আমাদের দুই ভাই এর। 
এক দিন ছোটু কে নিয়ে আমি যখন মাঠে খেলতে যাচ্ছিলাম তখন রাস্তার পাশে বসে থাকা লোকজন আমাকে উদ্দেশ্য করে বলেন _ “আরে তোর ভাই এতো সুন্দর ও ফর্সা কিন্তু তুই এতো কালো কেনো, ঠিক যেনো বাঁদর।” এই বলে তারা নিজেদের মধ্যে হাসা হাসি শুরু করে দিল। আমি তাদের কোনো জবাব না দিয়েই এগিয়ে গেলাম। কথাটা কর্ণপাত না করলেও ব্যাপারটা নিয়ে ভাবতে বাধ্য হলাম। যে কেনো তারা এরকম একটা কথা বলল, কিন্তু কতক্ষণ!, খেলা করতে মাঠে কখন পৌঁছব তানিয়ে ব্যাস্ত ছিলম।


ধীরে ধীরে সময় কাটতে থাকে এবং আমিও ওই ব্যাপারটা ভুলে যেতে থাকি। কিছুদিন পরে আমি পঞ্চম শ্রেণীতে ভর্তি হয়। নতুন স্কুল, নতুন বন্ধু পেয়ে 
 খুবই খুশি ছিলাম। বেশ সুন্দর ভাবে কাটছিলো স্কুলের দিনগুলো। এরমী একদিন টিফিনে খেলার সময় আমার বন্ধু আমাকে কালু বলে ডাকলো, আমি তার কাছে জানতে চাইলাম যে আমার নাম না নিয়ে তুই আমাকে কালু বলে কেনো ডাকলি? সে আমায় উত্তরে বলল_ কালো কে কালু বলবো নাতো কি হেরো হেন্সাম বলবো!তার এই কথাটা শুনে আমি মনে মনে ভাবতে শুরু করলাম তাহলে কি এই বর্ণটাই আমার আসল পরিচয়!


আবার পুরোনো কাকা বাবুর কথা মনে পড়লো, যিনি আমাকে বাঁদর বলে মন্তব্য করে ছিলেন।
সেদিন হইতো আমি ভেবে ছিলাম ওনারা আমাকে নিয়া একটু মজা করছে, কিন্তু আজ বুঝতে পরলাম যে- এটা একটি রোগ, যা গোটা বিশ্বে ছড়িয়ে রয়েছে। বর্ণ বিভেদ রোগ, যেটা কালক্রমে এক হিংস্র রূপ ধারণ করেছে। এবং কিছু দিন আগে ঘটে যাওয়া একটি ঘটনা সেটা প্রমাণ করে দিল।

ঘটনার বিবরণ~

২৫/০৫/২০২০ _ আমেরিকাই ‘জর্জ ফ্লয়েড’ নামক এক বাসিন্দা কে আমেরিকার পুলিশ গ্রেফতার করেন,
কারণ সেই ব্যাক্তি( জর্জ ফ্লয়েড ) মুদি খানা দোকানে ২০ ডলারের জালি টাক দিয়ে জিনিস কিনছিলেন। তাই তাকে গ্রেফতার করা হয়। এতক্ষণ সব ঠিক ছিল, কিন্তু এর পরে যা ঘটলো তা বিশ্বাস করে উঠতে পারছিলাম না। অন্য কোনো ব্যাক্তি থাকলে হয়তো তাকে জেল বা কিছু জরিমানা দিতে হতো, কিন্তু জর্জ ফ্লয়েডের প্রতি অন্য রকমের ব্যাবস্থা নিলেন ওই পুলিশ কর্মী।


জর্জ ফ্লয়েড কে ধরা হলো এবং তার হাত দুটোকে পেছনে বেঁধে তাকে প্রচন্ড মারধর করা হলো। প্রচন্ড মারধর করার সত্বেও পুলিশের মনে শান্তি হয়নি, জর্জ ফ্লয়েড কে মাটিতে শুইয়ে তার গলার ওপর পুলিশ কর্মী টি তার হাঁটু জর্জ ফ্লয়েডের গলাই চাপিয়ে বসে পরে, এই ভাবে হাঁটু দিয়ে চাপ দেওয়াই ফ্লয়েড-এর দম বন্ধ হয়ে যায় এবং সে সেখানেই মারা যায়। আর এত নিষ্ঠুর ভাবে মারার একটাই কারণ ছিল যে -
জর্জ ফ্লয়েড একজন কালো বর্ণের লোক ছিলেন আর ওই পুলিশ কর্মী একজন ফর্সা আমেরিকান। ওখানকার আশেপাশে থাকা ব্যাক্তি পুলিশ কর্মী দের এই ভাবে মারতে বারণ করলেও, পুলিশ কর্মী কোনো রকমের কথাই শুনলনা এবং শেষে জর্জ ফ্লয়েড এর দম বন্ধ হয়ে মৃত্যু হলো। 

কেনো এরকম নিষ্ঠুর ব্যাবহার?  ঈশ্বরতো কোনোদিন আমাদের মধ্যে বিভেদ আনেনি, তিনি যেমন দিন কে উজ্জ্বল এবং আলোক ময় তৈরি করেছেন, তেমনি রাত্রি কেউ সুন্দর ও শীতল বানিয়েছেন, তিনি এত সুন্দর ভাবে দুজন কে সাজিয়েছেন যে - দিন ছাড়া রাত্রি কল্পনা করা যায় না, আর রাত্রি ছাড়া দিন ভাবা যায় না।   তাহলে মানুষের মধ্যে এরকম বিভেদ মূলক বিচার ধারা কথা থেকে এলো?_ এই সব প্রশ্ন গুলো বার, বার হানা দিতে থাকলো আমাকে।  অবশেষে  আমার এই সব প্রশ্নের উত্তর মিলল , শিশু দের একটি অক্ষর মালা বই-এ। 


যেখানে‘সুন্দর’কথা টি বর্ণনা করার জন্য একটি ফর্সা মহিলার ছবি, এবং ‘অরূপ’ ( সুন্দরতা হীন ) এর বর্ণরার জন্য একটি কালো মহিলার ছবি দেওয়া ছিল। এই দেখে বুঝতে পারলাম যে আমাদের মনে এই বর্ণ বিভেদের শিক্ষা বাল্যকাল থেকেই  দেওয়া হয়ে থাকে, যা  সময়ের সাথে সাথে  অভ্যাসে পরিণত হয়। তারপর শুরু হয়ে যায় কালো সাদা নিয়ে ঠাট্টা, মজা,এবং অসম্মান করা।
 গায়ের রং কালো বলে সে নোংরা, কালো মানেই অরূপ, এই সব বিচার করা, কিন্তু বিচার করার কাজ আমাদের নয় ঈশ্বরের। তারা ভুলে যায় যে মানুষের পরিচয় মানবিকতার দ্বারা, বর্ণ নিয়ে নয়। মনুষ্য হিসেবে মানবিকতা এবং  হৃদয়ে প্রেম থাকলে কালো কিংবা ফর্সা উভয় কিন্তু সুন্দর। আর যদি তা না থাকে তাহলে সে ফর্সা হয়েও সুন্দর নয় এবং কালো হয়ও সুন্দর নয়, কারণ তার মন সুন্দর না। তাই কখনোই কোনদিন কাউকে শুধুমাত্র বর্ণের দ্বারা বিচার করাটা ঠিক নয়। 

মন্তব্যসমূহ

এই ব্লগটি থেকে জনপ্রিয় পোস্টগুলি

গাধার সাথে তর্ক [ Arguing With The Donkey ]

বিজয়ী [ winner ]

উদ্দেশ্যহীন জীবন [LIFE Without Hope]